ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং

ফ্রিল্যান্সিং বর্তমানের পছন্দের ক্যারিয়ার গুলোর মধ্যে অন্যতম একটি আলোচ্য বিষয় । আজ আমরা এই ফ্রিল্যান্সিং এর অন্তর্গত প্রায় সকল বিষয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করবো । যারা হয়তো ফ্রিল্যান্সিং শুরু করতে চাচ্ছেন, কিংবা ইতিমধ্যেই ফ্রিল্যান্সিং এর সাথে জড়িত আশা করি – এই লেখাটি সকলের অনেক কাজে লাগবে ।

ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং কি

যদি প্রশ্ন করা হয় ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং কি একই? উত্তর হচ্ছে না না না। আমরা অনেকই এই বিষয়টাকে গুলিয়ে ফেলি, এবং ভুল বলি যে ফ্রিল্যান্সিং আর আউটসোর্সিং একই বিষয়। কিন্তু সত্য হচ্ছে এই দুটি বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। তাহলে এখন প্রশ্ন ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং কি ?

ফ্রিল্যান্সিং কি ?

ফ্রিল্যান্সিং(Freelancing) একটি ইংরেজি শব্দ, যার বাংলা অর্থ মুক্তপেশা । এখানে মুক্তপেশা বলতে এমন একটি পেশা কে বুঝানো হয়েছে যেটা করার ক্ষেত্রে প্রচলিত চাকরি/পেশার মত এখানে কোন বাধ্যবাধকতা নেই। ফ্রিল্যান্সিং কাজ বা ফ্রিল্যান্সিং করা হচ্ছে এমন একটি পেশা যেখানে আপনি অনেকটা স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারবেন। অর্থাৎ ফ্রিল্যান্সিং হচ্ছে স্বাধীন ভাবে কোন কাজ করা। স্বাধীন ভাবে কথার অর্থ আপনি যেকোনো সময় যেকোনো ভাবে, যেকোনো অবস্থায় কাজটি করতে পারবেন। আপনি চাইলে কাজটি নাও করতে পারেন

আউটসোর্সিং কি ?

আউটসোর্সিং বলতে বোঝায়, যখন কোন কোম্পানি বা ব্যক্তি তার বা তাদের কোন কাজ যদি বাইরের দেশের কোন ব্যাক্তি বা কোম্পানি কে দিয়ে করিয়ে নেয়। অর্থাৎ আউটসোর্সিং বলতে কাজ করিয়ে নেয়া কে বুঝায়। আমরা যদি কোন বিদেশি বায়ারের কাজ করি, এই ক্ষেত্রে সেই বিদেশি বায়ার আসলে আউটসোর্সিং করছে, এবং আমরা করছি ফ্রিল্যান্সিং।

ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং এর মধ্যে পার্থক্য

ন্সিং ও আউটসোর্সিং এর মধ্যে পার্থক্য নিচে দেওয়া হল –

পার্থক্যের বিষয়

ফ্রিল্যান্সিং

আউটসোর্সিং

অর্থ

ফ্রিল্যান্সিং শব্দের অর্থ মুক্তপেশা। 

আউটসোর্সিং শব্দের অর্থ বাইরের দেশের কাউকে দিয়ে চুক্তিভিত্তিক কাজ করানো।

সংজ্ঞা

যখন কেউ মুক্তপেশাজিবী হিসেবে, কোন বাধ্যবাধকতা ছাড়া যে কাজ করে তাকে ফ্রিল্যান্সিং বলা হয়।

কোন কন্টাক্টের ভিত্তিতে যখন বিদেশি কাউকে দিয়ে কাজ করা হয়, তাকে আউটসোর্সিং বলে।

কাজের ধরন

কাজ করাকে বুঝায়। 

কাজ করানোকে বুঝায়।

স্বাধীনতা

ফ্রিল্যান্সিং এ আপনি স্বাধীনভাবে যেকোনো কাজ নিতে পারবেন, চাইলে ক্যান্সেল করতে পারবেন। 

আউটসোর্সিং এ আপনি আপনার ইচ্ছা মত বা প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়োগ দিতে পারবেন।

আয়/ব্যয়

ফ্রিল্যান্সিং এর মাধ্যমে আয় বা ইনকাম করা হয়।

আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে ব্যয় করা হয়, অর্থাৎ এক্ষেত্রে টাকা খরচ হয়।

শেখা

ফ্রিল্যান্সিং শেখা যায়।

আউটসোর্সিং এর ক্ষেত্রে শেখার তেমন কিছু নেই।

পদের নাম

যারা ফ্রিল্যান্সিং করেন, তাদের ফ্রিল্যান্সার বলা হয়।

যারা আউটসোর্সিং করেন, তাদের আউটসোর্সার বলা হয়।

অর্থ

আয় বেশি করার জন্য ফ্রিল্যান্সিং করা হয়।

কম খরচে কাজ করানোর জন্য আউটসোর্সিং করা হয়।

কর্মপদ্দতি

ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য ফ্রিল্যান্সাররা মার্কেটপ্লেসে কাজ বিড করে। 

আউটসোর্সাররা আউটসোর্সিং করার জন্য মার্কেটপ্লেসে কাজ পোষ্ট করে।

সুবিধা

ফ্রিল্যান্সারদের জন্য কাজ করা সুবিধা, যেকোনো জায়গায়, যেকোনো সময় কাজটি একজন ফ্রিল্যান্সার করতে পারেন।

আউটসোর্সাররা তাদের টাইমলাইন অনুযায়ী কাজ পোষ্ট করে, এক্ষেত্রে তাদের পছন্দের ক্যান্ডিডেট কে সে নিয়োগ দিতে পারে।

অসুবিধা

ফ্রিল্যান্সার কাজ এর ক্ষেত্রে পেমেন্টের গ্যারান্টি নেই। ক্লায়েন্টের কাজ পছন্দ না হলে পেমেন্ট নাও পেতে পারেন।

আউটসোর্সাররা যে টাইমলাইনে কাজ পোষ্ট করে, সেই টাইম অনুযায়ী কাজ নাও সম্পূর্ণ হতে পারে।

উদাহরন

আপনি যদি ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে কোন কাজ বিড করে নেন, বা ক্লায়েন্ট আপনাকে কোন কাজ দেয়, সেটাই হবে ফ্রিল্যান্সিং ।

আপনি যদি কোন কাজ করানোর উদ্দেশে ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেসে সেই কাজ পোষ্ট করেন, এবং কাউকে কাজটি দেন সেটাই হবে আউটসোর্সিং।

ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং এর মধ্যে পার্থক্য

ফ্রিল্যান্সিং কেন এত জনপ্রিয় হচ্ছে ?

বর্তমান ফ্রিল্যান্সিং জনপ্রিয় পেশা গুলির একটি, এবং খুবি লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে এখন প্রচুর মানুষ এই পেশার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অবাক বিষয় যে, যারা অন্যান্য পেশার সাথে জড়িত তারাও চাচ্ছে ফ্রিল্যান্সিং শিখতে। এমনকি এরকম উদাহরন ও অনেক যে প্রথমে অন্য পেশায় ছিলেন, পরে ফ্রিল্যান্সিং কে পেশা হিসেবে নিয়ে এখন আরো ভালো করছেন । প্রশ্ন হচ্ছে এর পিছনে কারন কি ?

কারন এখানে একটা নয়, অনেক গুলো কারন এখানে কাজ করেছে বলে আমি মনে করি । যেমনঃ আমরা যেসব দেশের সাথে কাজ করি, তাদের বেশির ভাগেরই কারেন্সির/টাকার দাম আমাদের দেশের কারেন্সির দামের চেয়ে অনেক বেশি । তাই আমাদের দিয়ে কম মুল্যে কাজ করিয়ে নিলেও আমরা বেশি অর্থ পাই। আবার আমাদের দেশের বেকার সমস্যার সমাধান হিসেবেও এই ফ্রিল্যান্সিং পেশা কার্যকরী । এছাড়া বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির অগ্রসর এর কারনে ইন্টারনেট এবং এই রিসোর্স গুলো সহজ লভ্য। তাই যে কেউ ফ্রিল্যান্সিং সহজেই শুরু করতে পারছে । এবং এখনও এই সেক্টরে স্কিলফুল লোকের পর্যাপ্ত অভাব থাকার কারনে, অল্প স্কিল নিয়েও অনেকেই ভালো করছে। তাই ফ্রিল্যান্সিং এর জনপ্রিয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে ।

ফ্রিল্যান্সিং কিভাবে শুরু করব ?

বাস্তবে ফ্রিল্যান্সিং কোন কাজ নয়, আসলে কোন একটা কাজ দিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করা হয়। অর্থাৎ আপনি কোন কাজ না জানলে ফ্রিল্যান্সিং করতে পারবেন না। তাই ফ্রিল্যান্সিং করার জন্য অবশ্যই আপনাকে একটি কাজ শিখতে হবে ।

এখন প্রশ্ন করতে পারেন ফ্রিল্যান্সিং এর জন্য কোন কাজ শিখলে ভালো হবে ? কোনটা সহজ ? কোনটা শিখে তারাতারি আয় করা যাবে ? ইত্যাদি ।

আসলে এই ধরনের প্রশ্নে এক্সপার্ট বা স্কিলফুল মানুষ খুবই বিব্রত বোধ করে, কারন এসব প্রশ্নের উত্তর একেক জনের জন্য একেক রকম হয়, আবার উত্তর গুলিও একেক জন একেক ভাবে দেয়, এবং কিছু প্রশ্ন উত্তর তো শুধু আপনিই দিতে পারবেন ।

যেমন আপনি যদি প্রশ্ন করেন, কোন কাজ টা শিখব ? উত্তর – যে কাজটা করতে ভালো লাগে , সেইটাই করুন। এই উত্তরে অনেকে অনেক ভাবে আবার প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, যেমন – সবই ভালো লাগে, আবার অনেকে বলে কোনটা ভালো লাগে আমি বুঝতে পারছিনা ইত্যাদি। এমনকি অনেকেই বলেন কোন কাজটা কেমন, সেটা বুঝিনা। তো এসবের উত্তর আপনি খুব সহজেই বের করতে পারেন, এবং এর দায়িত্ব আপনার, কারন আপনার কোনটা ভালো লাগবে বা সহজ লাগবে, সেটা একমাত্র আপনিই তো জানেন তাইনা। এটা অন্য কেউ কিভাবে বলবে?

আপনার যদি এসব কাজ সম্পর্কে আইডিয়া না থাকে, আপনার উচিত কিছুদিন সময় নিয়ে কাজ গুলো সম্পর্কে আইডিয়া নেয়া, তারপর আপনি নিজেই বলতে পারবেন, কোনটা আপনার জন্য সহজ অথবা ভালো লাগছে।

কাজ চয়েজের জন্য কিভাবে চিন্তা করা যেতে পারে ?

কাজ চয়েজ করার জন্য, আপনি কাজের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করতে পারেন । যেমনঃ

  • কাজটি শেখার জন্য যে বেসিক নলেজ গুলো দরকার, সেগুলো আপনার মধ্যে আছে কিনা ।
  • কাজটি শেখার জন্য যে পরিমান সময় প্রতিদিন দরকার, আপনি সেটি দিতে পারবেন কিনা ।
  • কাজটি কি আপনার পছন্দের ? আপনার যদি কাজ পছন্দই না হয়, আপনি দীর্ঘদিন এইটা নিয়ে কাজ করতে পারবেন না ।
  • কাজটি সামনের দিনগুলোতে থাকবে কিনা , এই সম্পর্কেও আইডিয়া মাথায় রাখা উচিত ।

তো এবার যেকোনো একটি কাজ চয়েজ করে, সেটি শেখা শুরু করে দিন।

কিভাবে শুরু করতে পারি কাজ শেখা বা স্কিল ডেভেলপমেন্ট ?

কাজ চয়েজ করার পর, আপনি কাজ টি কিভাবে শিখবেন এই সম্পর্কে আইডিয়া নিতে আপনি বিভিন্ন ব্লগ এবং আর্টিকেল পড়তে পারেন। নিতে পারেন এই কাজের যারা এক্সপার্ট তাদের হেল্প । খুজে বের করুন তাদের, যারা এই কাজটি নিয়ে অলরেডি ভালো কাজ করছে । আপনার আশে-পাশে বা পরিচিত কাওকে পেলে সবচেয়ে বেশি ভালো হয়।

এরকম কারো কাছে আইডিয়া নেয়ার পর আপনি কাজের চেকলিস্ট তৈরি করে কাজ শেখা শুরু করবেন। একটি টার্গেট তৈরি করে নিবেন, যেমন – আগামী ১ সপ্তাহে আপনি এই এই শিখবেন । এবার চেকলিস্ট ফলো করে কাজ শেখা শুরু করে দিন ।

কাজ শেখার জন্য কি কোর্স করতে হবে ?

কাজ শেখার জন্য আপনার কোর্স বা ট্রেনিং করতে হবে বাধ্যতামূলক, এরকম কোন কথা নেই । আপনি চাইলে নিজে নিজে ও শিখতে পারেন ।

কোর্স করা কি ভালো নাকি নিজে শেখা ভালো ?

এটার উত্তর আপনার জন্য আপনিই ভালো ভাবে দিতে পারবেন, তবে আমার মতামত – আপনি যে বিষয়টি শিখতে চান, সেই বিষয়ে যদি আপনি একদম-ই নতুন হন এবং আপনাকে কাজে সাহায্য করার কেউ না থাকে, কোর্স করে নেয়া অনেক ভালো হবে। অবশ্যই কোর্সের জন্য আপনাকে ভালো ট্রেনিং সেন্টার খুজে বের করে সেখানে কোর্স করতে হবে। তবে ভালো ট্রেনিং সেন্টার খুজে না পেলে, একাই শেখার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

কাজ শেখার সময় বিভিন্ন সমস্যা এলে কি করবো ?

এটা একটি কমন প্রশ্ন, আমরা কাজ শেখার সময় প্রব্লেম এর সম্মুখীন হইনি, এরকম মানুষ হয়তো খুজে পাওয়া যাবেনা । তাই নতুন কাজ শিখতে গেলে আপনি এগুলো ফেস করবেন এটাই স্বাভাবিক, তাই সমস্যা হলে ভয় বা মন খারাপ করবেন না । বেশির ভাগ অনলাইন বা ফ্রিল্যান্সিং রিলেটেড কাজ গুলির বিভিন্ন সমস্যার সমাধান অনলাইনেই আছে, আপনি গুগল সার্চ করে বের করতে পারেন। এছাড়া আপনার কাজ রিলেটেড অনেক ফেসবুক গ্রুপ, ফোরাম, ব্লগ খুজে পাবেন। যেগুলো ব্যবহার করে আপনি কাজের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান সহজে বের করতে পারবেন ।

কতদিন বা কতটুকু কাজ শিখলে আয় করতে পারবো ?

এটা বিভিন্ন কাজের উপর ডিপেন্ড করে, বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিমান সময় লাগে আয়ের উপযুক্ত হতে । আবার একই কাজের উপর বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন পরিমান সময় লাগতে পারে । তাই এসব না ভেবে কাজ শেখা শুরু করুন, মনে রাখবেন কাজ শিখলে আপনার আয়ের পথ একভাবে না একভাবে খুলে যাবেই, তাই আগেই আয়ের দিকে মনোযোগ না দিয়ে আমাদের কাজ শেখার দিকে মনোযোগ দেয়া উচিত।

নিয়মিত কাজ শেখা আর চর্চার মাধ্যমে আপনি একটি লেভেল এ যাওয়া পর পর ই বিভিন্ন মার্কেটপ্লেসে একাউন্ট ওপেনের মাধ্যমে ফ্রিল্যান্সিং শুরু করা প্রস্তুতি নিতে পারবেন ।

সবশেষে আপনার জন্য শুভকামনা ।

Spread the love

7 thoughts on “ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং”

  1. Its really amazing my all doubt about it is clear now and i will suggested this blog to those who want to build their carrer in freelancing sector this will guide them om their right path.

    Reply
  2. অনেক সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেছেন। অনেক কিছু জানতে পারলাম আপনার পোস্ট পড়ে। ধন্যবাদ।

    Reply
  3. পোস্ট গুলো পড়ে ফ্রিল্যান্সিং বিষয়ে একটা পরিপূর্ণ ধারণা পেলাম, অনেক কিছু জানতে পেরেছি!
    ধন্যবাদ priyokotha.com

    Reply
  4. ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ারের যুগোপযোগী কিছু কথা জানতে পারলাম এখনে ।
    আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো তুলে ধরার জন্য ।
    এবং সকলকে জানার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার জন্য ।
    ” অসংখ্য শুভকামনা আপনার জন্য “

    Reply

Leave a Comment